প্রশান্ত বারিক
জন্মভূমি , শতকোটি ভূমিষ্ঠ প্রণাম
বাংলা মা আমার
প্রশান্ত বারিক
পাকা ধানের ক্ষেতে হেসে উঠল শীতের সকাল
ঝলমলিয়ে উঠল বাংলার শ্যামলা বধুটির নাকের নথ
আদুলপায়ের পাতায় ঝুনুক ঝুনুক অহংকারী নূপুরের ধ্বনি
সেই পায়ে চুমা খায়ে লতাগুল্স দূর্বাদল দোণফুল শুষনি হেলেঞ্চা....
এই তো অনন্ত লক্ষী মা আমার __
ললাটে ও কপোলে লেগে আছে অপার লালিমা।
মুক্তোশুত্র দাঁতে শালুখনাল চিবোতে চিবোতে __
প্রকৃতির আদিছন্দে হেটে যান চিরচেনা আলপথ ধরে __
পিছে পিছে তার টলোমলো পায়ে ছুটে আসছে উলঙ্গ এক শিশু ...
এই অন্্রাণেও তার শীত করে না
দুরন্ত আলচিতি খরিশেরা দংশায় না
তার ছোটা ছোটা পায়ের আঙ্ল__
চাষার ছেলে চাষা সে অনাদিকালের ভূমিপূত্র
পূর্বজের অস্থিমজ্জা রক্ত ঘাম
আর এই পৃথিবীর বহুবর্ণ মাটি দিয়ে গড়া
এই সজল শ্যামল অন্নদা বাংলার __
এই কাঁকুরে লাল ভৈরবী বাংলার
চির বিদ্রোহী সন্তানের বিনাশ নেই __
সে তো অন্তহীন অমর....
তার বলিষ্ঠ নাঙ্গা পায়ের ছাপ
ধান পাট আলু পেঁয়াজ হলুদ লঙ্কার খেতে,
শাল মহুল গণহার কেন্দুর আদিম জঙ্গলে
শালবনী জামবনী বান্দোয়ান
গোয়ালতোডের লাল প্রান্তরে
অসম যুদ্ধের রক্তাক্ত মহড়ায়.....
দুই
চিরন্তনী মৃন্ময়ী মা আমার -
তোমাকে দেখেছি আমি বসিরহাট বাদুড়বাগানের
আমকাঁঠাল জামরুল নারকেল সুপারির ঘনঘোর ছায়াপথে
দেখেছি রাজারহাটের খিলখিলানো হরিৎ প্রান্তরে
ঢেউ খেলানো চাঁদমনি চায়ের বাগানে
মধ্যমগ্রাম - নিউব্যারাকপুর রেল ব্রিজে বসে দেখেছি-
সালংকারা প্রতিমা তুমি ক্ষণিকের দেখা দিয়ে-
নোয়াইখালির নোনাজলে নিমেষে তলিয়ে গিয়েছো
তোমার নাড়িছেড়া সন্তান আমি
তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে ভূতগ্রস্থের মতো ঘুরে মরি
ইব্রাহিম লোদী আলাউদ্দিন খিলজী গিয়াসুদ্দিন তুঘলকের-
প্ররপ্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে
লতাগুলম বৃক্ষে ঢাকা গোরস্থানের ভেতর-
তোমার মাটি মাটি গর্ভগন্ধ
বুকের ভেতর টেনে নেওয়ার বোবা আকাঙ্কষায়
কিন্তু পাই না তো ভেজা ভেজা মা গন্ধের সুখদ পরশ
শুধু পাষাণভারী মাথার ভেতর চামচিকে বাদুড়েরা ডানা ঝাপটায় -
আশরীর কাঁপিয়ে অলৌকিক আঁধার নামে
যমুনার তীর থেকে ভেসে আসে ফেউয়ের অশুভ ডাক -
বিষাদ নিরজনতায় অজস্র বাঁসপাতা ঝরে ঝরে পড়ে
উড়ে বেড়ায় শিমুল তুলো শিরীষের ফুল
বাংলার চিরন্তন বিদ্রাহীদের আত্মা যেন এরা সব,
অসংখ্য বীজ হয়ে আমার চারপাশে ওড়ে ...
তিন
হাজার মাইল দূরে বসেও টের পাই
পাটি ক্যাডার লুম্পেনদের লুট-হত্যা ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণে-
ছেঁড়া খোঁড়া দেহমন নিয়ে
কত কন্যা কুলবধূ স্বামী পূত্রহীন হয়ে বুক চাপড়ে কাঁদে..
তবু কেন আকাশ ফাটেনা
এই ধর্ষণকারী খুনিদের পায়ের তোলে লুণ্ঠিতা
সুজলা-সুফলা মা আমার
এই দূর আর্যাবর্তে বসে
তোমার গুমরানে কান্না শুনি আমি
বুকের পাঁজর ভাঙ্গে, দুচোখে আগুন লবণ গড়ায়...
দেখি তোমার সবুজাভ মুখখানি.
অগণিত সন্তানের রক্তে ঢেকেছে
ধুধু বুকে শ্মশানের হাড়গোড় খুলি
শুকনো নদীর চরায়
ধর্ষিতা বালিকা ও যুবতীর আধপেড়া লাশ
শিয়াল কুকুরেরা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়
ইস্পাত আকাশে মড়াপোড়ার গন্ধ
উড়ে ছাই ঘূর্ণি হাওয়ায়
অসংখ্য ভুমি কন্যার দ্ধ আত্মা কেদে মরে
তোমার এই করুন ডাঙায়
-----------------
ঘাসফুল
প্রশান্ত বারিক
মোহময় সবুজের ভিতর
হিলহিলে হিংসা লুকিয়ে আছে
ভোরের শিশিরে জমাট রক্ত ভাষা
মুক্ত পুরুষের
বাংলা মায়ের বুক ফাড়ে লোহানখ
বার বার ধর্ষণ করে সুরম্য নদীকে
লোপাট গাছপালা মহিরুহ
পথ থেকে উধাও
কলস্বরা ঝতুমতি বালিকা কিশোরী
পেছনে শাগরিদ্
ভটভট শব্দে এলাকা কাঁপিয়ে
ছুটছে শৃগালচোখ দলনেতা,
বালি মাটি গাছ পাথর
গায় বাছড়া মেয়ে পাচারের দালাল
ফোরেস্ট-বাংলোর পেছুয়াড়ীর
উজাড় বনভূমি ডাঙ্গা মাঠ জুড়ে
মক্ষিরানীর ভোটব্যাংক,
অগনিত পিল্লা পয়দার মাহির
ঘিনঘিনে যত কীড়ামাকোড়ার বসত
রক্ত ফেনা মুখ, ঘূর্ণি হাওয়ার পিঠে,
হন্তারক সময়
জৈষ্ঠের তাতা পোড়ার লালপথ
দূর-দূরান্ত থেকে খেদিয়ে আনা
ক্লান্ত-এস্ত,-অসহায়-গরুগুলোর
ফুধা,-তৃষ্ণায়,-কাতর চোখ দেখো,
শুকনো খরখরে জিভ
ছাতি ফটো-ফাটো
দানাপানির বদলে-
পিঠে ক্রমাগত লাচমার,
মা-বহিন- খিস্তি -খেউড়....
পঞ্চায়েতের লাল পথে,
ভ্রমাগত গরু কাটার খচ খচ শব্দ ওঠে
প্রেতহাওয়া- রক্ত গন্ধ ছড়ায়....
লালচক্ষু হলুদ দাঁত
সমবেত দুপেয়ে খাদকদের
সিনা-কলিজা-রাংও চর্বির চর্চা
আমোদ উল্লাস
কার চক্রান্তে আমার এই ধর্মনাশ,
পাপের সঞ্চয়....
চৌমুখি চোঙায়
অহর্নিশ গলা ফাড়,উৎকট বমন উদ্-গার
সাউদের পরিত্যক্ত বাগানে
বাতিল বিড়িপাতা এঁটো কাঁটা কেঁথাকানি
মাছি ভনভন্ লতৃপতে ন্যাপকিন
জবাই গরু মুরগীর ছাট
দিনরাত ধিকি ধিকি আগুন ধোঁয়ায়-
চোখ-মুখ জ্বলে, শ্বাসকষ্ট হয়....
পল্লি মায়ের হেঁসেলে আজ
গম আটার সুস্বাদু রুটির গন্ধ নাই
স্বাদ-গন্ধহীন মোটা চালের ভাত
আর পোকা লাগা আতপ চাল গুঁড়োর...
গলাফাড় কালচে রুটি খেয়ে খেয়ে....
কাটে দিন, কাটে রাত
প্রত্যহ গুলুগুলু বোবা চোখের সামনে
হাঁমুখ খোলে
রক্তাক্ত নদী নালায় ভরা
ঘাসফুল বাংলার মুমূর্ষু্ সকাল।
Comments
Post a Comment